# Tags

ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও বিনোদন: দিনাজপুরের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :দিনাজপুর জেলা শুধু একটি নাম নয়, এটি উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আর প্রকৃতির এক জীবন্ত দলিল। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৪১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই শহরটি তার ঐতিহাসিক নিদর্শন, মন-ভোলানো প্রাকৃতিক দৃশ্য আর জগৎখ্যাত স্বাদের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক ‘ভূ-স্বর্গ’।
১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শহরটি ঐতিহ্যের ভারে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে দুটি স্থাপনা এখানে আসা প্রতিটি পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ: কান্তজির মন্দির (নবরত্ন মন্দির): ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত এই ১৮ শতকের স্থাপত্যশৈলী যেন পোড়ামাটির ফলকে আঁকা এক মহাকাব্য! মন্দিরটির বাইরের দেয়ালে মহাভারত, রামায়ণসহ পৌরাণিক কাহিনিগুলো প্রায় ১৫ হাজার টেরাকোটায় চিত্রিত। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে উচ্চতা কিছুটা কমলেও, এর মনোমুগ্ধকর কারুকার্য আজও দর্শককে বিস্মিত করে।
নয়াবাদ মসজিদ: কান্তজির মন্দির থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত ১৭৯৩ সালে নির্মিত এই অনন্য মসজিদটি। এখানকার ১০৪টি টেরাকোটার কারুকার্য আর নির্মাণের পেছনের স্থানীয় মুসলিম স্থপতিদের গল্প এই স্থানটিকে করে তুলেছে ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
দিনাজপুর রাজবাড়ী: ভগ্নপ্রায় অবস্থায় থাকলেও কুমার মহল, আয়না মহল, লক্ষ্মীর ঘর, ঠাকুর ঘর ও রাণী পুকুর নিয়ে গঠিত এই জমিদার বাড়িটি আজও দিনাজপুরের একসময়ের সমৃদ্ধির নীরব সাক্ষী।
দিনাজপুর শুধু ইতিহাসের শহর নয়, এটি প্রকৃতিরও লীলাভূমি। এখানে রয়েছে দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম দিঘি এবং দুটি সুবিশাল জাতীয় উদ্যান। রামসাগর দিঘি: বাংলাদেশের বৃহত্তম এই কৃত্রিম দিঘিটি রাজা রামনাথের কীর্তি। প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার ক্ষেত্রফল আর ১০ মিটার গভীরতার এই দিঘির পাড় এখন রামসাগর জাতীয় উদ্যান। পূর্ণিমায় এখানে ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা এটিকে করে তুলেছে অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য।
জাতীয় উদ্যান (নবাবগঞ্জ): ৫১৮ হেক্টরের এই শালবন ২০১০ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর ভেতরের প্রায় ৬০০ একরের আশুরার বিলের ওপর নির্মিত উত্তরবঙ্গের সব থেকে বড় কাঠের ব্রিজ পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে এখানেই দস্যু রত্নাকর বাল্মীকি মুনিরূপে খ্যাতি লাভ করেন।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান: বীরগঞ্জ উপজেলার এই পিকনিক স্পটটি প্রায় ৮৫৬ একর বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত। শিশুদের রাইডস, সেতু ও বনের শান্ত পরিবেশ এটিকে পারিবারিক ভ্রমণের জন্য আদর্শ করে তুলেছে।
ঐতিহ্য আর প্রকৃতির পাশাপাশি আধুনিক বিনোদনের জন্য রয়েছে: স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট: ফুলবাড়ী উপজেলার এই ৪০০ একরের সুন্দর নকশাকৃত পার্কটি কৃত্রিম হ্রদ, পাহাড়, চিড়িয়াখানা, কটেজসহ নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা নিয়ে দিনাজপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
দীপশিখা মেটি স্কুল: বিরল উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামের এই ব্যতিক্রমী স্কুলটি মাটি, খড়, বালি ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এক অপূর্ব শৈল্পিক স্থাপত্য। পরিবেশবান্ধব এই ভবনটি দেশি-বিদেশি স্থপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
দিনাজপুরের নাম নিলেই সবার আগে আসে লিচু। প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের মতো লিচু গাছ নিয়ে গঠিত ৩ হাজার ১২৮টিরও বেশি বাগান এই জেলার সুখ্যাতির প্রধান কারণ। রামসাগরের পথে মাশিমপুর বা কান্ত নগরের নয়াবাদ গ্রামের পথের দু’ধারে দেখা যায় চোখজুড়ানো লিচু বাগান, যা গ্রীষ্মকালে ফলপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
দিনাজপুর ভ্রমণ এখন কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থান জানা নয়, বরং এটি উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্রে গিয়ে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে এক আত্মিক সেতুবন্ধন রচনা করা।